নুরুদ্দিন জিনকির কর নীতিও ন্যায়বিচারের উপর ভিত্তি করে ছিলো তিনি মিশর, সিরিয়া, আল-জাজিরা এবং মওসিলের উপর এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী ভারী কর মুকাস ও তিতার এর বিলুপ্ত ঘটান। নুরুদ্দিন জিনকি পরিবারের চাহিদা পূরন করতেন নিজের টাকা দিয়ে তিনি গনিমতের থেকে শুধু নিজের প্রাপ্ত অংশ নিতেন এর বেশি তিনি গ্রহন করতেন না এই ব্যাপারে তিনি ফকিহ দের কাছে ফতোয়া জানতে চেয়েছিলেন ফতোয়া অনুসারে তার প্রাপ্ত অর্থ গ্রহন করতেন। ইনবে আতির তার বইতে লেখেন একবার নুরুদ্দিন জিনকির স্ত্রী ইসমাত আল-দ্বীন নুরুদ্দিন জিনকির কাছে অভিযোগ করেন যে তার পরিবার চালানোর জন্য তার কাছে প্রয়জনীয় অর্থ ও সম্পদ নেই। এই অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর জন্য তিনি তিনি হিমসে৩ টি দেন যা বছরে ২০ দিনার উৎপাধন করতো। যখন তার স্ত্রী এই আয়কে অপর্যাপ্ত মনে করলেন তখন নুরুদ্দিন জিনকি তার স্ত্রীকে ধমক দিয়ে বলেন আমার কাছে আর কোন টাকা নেই আমার হাতে টাকা থাকা সমস্থ অর্থ এবং সম্পত্তি মুসলিম জনগনের যাদের আমি কোষাধ্যক্ষ তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার করার সাহস করিনা আর আমি তোমার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে জাহান্নামে যেতে রাজি নই( al-Bâhir, p. 298)। নুরুদ্দিন জিনকি সংসার ও সম্পত্তিকে গুরুত্ব দিতেন না, বিশুদ্ধ জীবন যাপন করতেন, সোনা-রূপা বা রেশমের পোশাক পরতেন না; তিনি একজন সংযত এবং মধ্যপন্থী ব্যক্তি ছিলেন এমন কি তার রাজ্যের দরিদ্রতম ব্যাক্তিও তার থেকেও বেশি খরচ করতো। একবার নুরুদ্দিন জিনকি ও তার বন্ধু গোড়া চালচ্ছিলো তখন সূর্য তাদের পিছনে ছিলো আর তাদের ছায়া তাদের সামনে ছিলো আর ফেরার পথে তাদের ছায়া পিছনে তাড়া করছিলো তখন নুরুদ্দিন জিনকি তার বন্ধুকে বলেন আমি এটা পৃথিবীর সাথে তুলনা করেছি পৃথিবী এমন এক ব্যাক্তির কাছ থেকে পালিয়ে যায় যে এটি জয় করতে চায় অন্যদিকে যে জয় করতে চায়না তাকে তাড়া করে। নুরুদ্দিন জিনকি হানাফী মাযহাব খুব ভালো ভাবে জানতেন কিন্তু কোন গোঁড়ামি প্রদর্শন করতেন না তিনি বেশিরভাগ সময় নামাজে কাটাতেন এবং তার ধর্মীয় জীবন যাত্রার প্রতিধ্বনি করতেন। জেরুজালেমের ক্রুসেডররা বলতো তিনি সৈন্য সংখ্যা দিয়ে নয় তিনি রাতের প্রার্থনার পরিমান দিয়ে আমাদের উপর বিজয়ী(Ibn al-Athir, XI, p. 323) । তিনি সবসময় চাইতেন যুদ্ধে ইসলামের জন্য শহীদ হওয়ার জন্য তিনি তার এই স্বপ্ন পূরনের জন্য অনেক বারই ক্রুসেডরদের সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন এমন কর্মকান্ড দেখে একবার ফাকিহ কুতুব আল-দীন আল-নেইসোবোরে তাকে বললেন হে গুরু আল্লহর দোহাই লাগে নিজেকে বিপদের মধ্যে ফেলবেন না আপনি নিহত হলে মুসলমানদের কে রক্ষা করবে তখন নুরুদ্দিন জিনকি বলেন নুরুদ্দিন জিনকি কে? আমার আগে কে ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষা করেছিলো? অবশ্যই আল্লাহ নিশ্চই তার কোন সমকক্ষ কেউ নেই(Ibn al-Athir, XI, p. 323;)।
নম্র হওয়ার পাশাপাশি নুরুদ্দিন জিনকি ছিলেন সম্মানিত ও মহান। নাজম আল-দীন ছাড়া তার কাছে বসার কেউ সাহস করতো না তবে নুরুদ্দিন জিনকি গরিব ও পন্ডিত সূফিসাধকদের অনেক সম্মান করতেন তিনি তাদের তার পাশেই বসাতেন তারপরে তিনি তাদের উদারভাবে দান করতেন কারনে তিনি বলতেন এরা আল্লাহর সৈন্য এদের প্রার্থনার জন্য আমরা আমাদের শত্রুদের পরাজিত করি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে তাদের একটি অংশ রয়েছে আমরা যা দেই তার থেকেও অনেক বেশি।
নুরুদ্দিন জিনকি প্রত্যেকটি আমল সৎ বিশ্বাসের সাথে পালন করতেন। একদিন এক আলেম তাকে বলেন চৌগান খেলা ইসলামে নেই এর জন্য তুমি গোর আজাব ভোগ করবে নুরুদ্দিন জিনকি তখন তাকে উত্তর দেন মানুষের কাজ কর্ম তার উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে আমি এই খেলা খেলি কারন আমি চাই এই খেলার ফলে আমার ঘোড়াগুলি আক্রমন এবং পশ্চাদপসরনে অভ্যস্ত হয়ে উঠুক আমরা কখনোই জিহাদে হারতে চাইনা। নুরুদ্দিন জিনকি ঘোড়া চালনায় এত দক্ষ ছিলেন যে ঘোড়া চলতি অবস্থায় তিনি তার উপর চড়তে পারতেন। ইবনে আতির বলেন নুরুদ্দিন জিনকির চেয়ে ভালো কেউ ঘোড়া চালনা করতে পারতো না তিনি এমন ভাবে এমন ভাবে ঘোড়া চালাতেন যে তাকে দেখে মনে হতো তিনি ঘোড়ারই একটা অংশ। ইসলামী প্রতিষ্ঠান স্থাপনে মুসলিম নেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন। তিনি দার আল-আদল এবং দার আল-হাদিস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা হাদীস বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ করতো। তার রাজত্বকালে বিজ্ঞানের অগ্রসর এবং সরকারী কাজের একটি মহান কার্যকালাপ লক্ষ করা যায়। নুরুদ্দিন জিনকি আলেপ্পো,হামা, হিমস,বালব্যাক,মনবিজ এবং অন্যান্য শহরে মাদ্রাসা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, স্যুপ রান্নাঘর, কাফেল, রিবট( শত্রুদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য সিমান্তের দফতর ভবন), খানকাহ(যেখানে সুফি সাধক, ও গরিবরা থাকতো) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তিনি গরিব শিক্ষার্থীদের সবসময় দান করতেন। নুরুদ্দিন জিনকি দামেস্কে একটি হাসপাতাল নির্মান করেছিলেন (বাইমারিস্থান) যা বিশেষত গরিব, অভাবী, ও বৃদ্ধদের চিকিৎসার জন্য নির্মান করা হয়েছিলো এখন সেটি যাদুঘর হিসেবে ব্যাবহৃত হয়। এছাড়াও তিনি এমন অনেক প্রতিষ্ঠান নির্মান করেছিলেন যা গরিব শিশুদের ,এতিম শিশুদের আশ্রয় প্রদান এবং বিদবা ও গরিব বৃদ্ধদের জীবন মান উন্নয়নে কাজ করতো। নুরুদ্দিন জিনকি রাস্ট্রের অর্থে এসব দাতব্য প্রতিষ্টান পরিচালনা করতেন। তিনি এই দাতব্য প্রতিষ্টান থেকে প্রাপ্ত আয় বেশিরভাগই ভিক্ষুক ও ভর্তুকি হিসেবে দান করতেন(Ibn al-Athir, XI, p. 324;)।
একবার একটি ঘটনা ঘটে যা মদিনার ইতিহাসে নুরুদ্দিন জিনকির বিশেষ ভূমিকা তুলে ধরেঃ খ্রিষ্টানরা মুসলিমদের আঘাত দিতে মুহাম্মদ (সাঃ) এর মৃতদেহ ইউরোপে পাচার করার পরিকল্পনা করে। এই কাজের জন্য নিযুক্ত ব্যাক্তিরা বহু বছর ধরে ইসলামি শিক্ষা নিয়ে মদিনায় এসেছিলো এবং মসজিদে নববীর পাশে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে একটি সুড়ঙ্গ খুড়তে থাকে। ১১৬২ সালের এক রাতে নুরুদ্দিন জিনকি নামাজ পড়ে ঘুমালে নুরুদ্দিন জিনকি নবীকে স্বপ্নে দেখেন তখন তিনি ভীত হয়ে আবার দুরাকাত নামাজ পড়ে ঘুমাতে যান তিনি আবার নবিকে স্বপ্ন দেখেন হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাকে এইবার তাকে বললেন তার দেহ চুরির ইঙ্গিত দিলেন। সুলতান বিচলিত হয়ে ঘুম থেকে উঠে আলেম কাছে ঘটনা খুলে বলেন এবং ১ হাজারের মত লোক জড় করে তিনি তৎক্ষনাৎ মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা দেন মদিনা পৌঁছলে তিনি শহরের সব লোক কে মসজিদের সামনে ডেকে পাঠান তিনি সবাইকে জিজ্ঞেসবাদ করতে থাকেন যখন তিনি জানতে মাগরিব থেকে দুইজন লোকই অনুপস্থিত আছে নুরুদ্দিন জিনকি তাদে আনার আদেশ দেন নুরুদ্দিন জিনকি তাদের সামনে রেখে তাদের বাসায় যান এবং তিনি বাসায় সব কিছু খুটিয়ে দেখতে থাকেন এই সময় জায়নামাজ উল্টিয়ে দেখেন সেখানে বিশাল এক সুরঙ্গ যা নবীর রওজার দিকে যাচ্ছিলো নুরুদ্দিন তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা সব খুলে বলেন এবং অপরাধ স্বীকার করেন নুরুদ্দিন তৎক্ষনাৎ তাদের দুজনের শিরশ্ছেদ করেন। তার পর তিনি এই তিনি ধরনের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন। তিনি মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সামাধি সেই সাথে আবু বকর ও উমারের সমাধি সীসা দ্বারা আবৃত, লোহারখাছা দ্বারা বেষ্টিত, এবং চারদিকে দেয়াল দিয়ে দ্বারা পরিবেষ্টিত করেন একই সাথে তিনি শহরের ক্ষতিগ্রস্ত দেয়াল গুলো মেরামত করেছিলেন। তবে অনেকেই বলেছেন এই সব গুজব তিনি হজ্জ পালন করার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন এবং শহরকে রক্ষার জন্যই শহরের সংস্কার করেছেন (42 Evliya Çelebi Seyahatnamesi, IX, İstanbul 1935, p. 621-626.)। সবমিলিয়ে দ্বাদশ শতাব্দীদে ক্রুসেডরদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের রক্ষক এবং জিহাদের নেতা হিসেবে নুরুদ্দিন জিনকি নিকটবর্তী প্রাচ্যের ইতিহাসে গভির চিহ্ন রেখে গেছেন। তার ২৭ বছরের রাজত্বে যুদ্ধ এবং সংগ্রামে পরিপূর্ন ছিল কারন তিনি এমন একজন নেতা ছিলেন যার লক্ষ্য বড় ছিল। তার সবছেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল মুসলিমদের একত্রিত করা এবং জেরুজালেম বিজয় করা যা পূরনে তিনি মৃত্যু পর্যন্ত দৃড় সংকল্পে চেস্টা করেছিলেন। মুসলিমদের একত্রিত করার স্বপ্ন অনেকাংশ পূরন করতে পারলেও জেরুজালেম জয় করার জন্য তিনি অতদিন বেঁচে ছিলেন না তবে তিনি তা জয় করা পথ অনেকাংশেই প্রশস্ত করেছিলেন তিনি মিশরের শাসন কর্তা হয়ে পূর্ব ও পশ্চিমের ক্রুসেডরদের আটকে রেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন তিনি একদিন জেরুজালেম বিজয় করবেন এর জন্য আলেপ্পোতে একটি কাঠের মিম্বার ছিল যা মসজিদুল আকসায় স্থাপনের কথা ছিল এই মিম্বার মসজিদুল আকসায় সালাউদ্দিন স্থাপন করলে এক ইহুদি মসজিদে আগুন দিলে তা পুড়ে যায়। ইনিই সেই সালাউদ্দিন যাকে নুরুদ্দিন জিনকি শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং ইসলামের ইতিহাসে তাকে অন্যতম করে তুলেন।
তাঁর রাজত্বকালে দামেস্ক বিদেশের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পূর্ণ বিজ্ঞানের একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। একটি রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রতিভা ছিল, নূর আল-দীন মাহমুদ একজন আন্তরিক ধর্মীয় ব্যক্তি ছিলেন এবং কোনও মাজহাবের পক্ষে তিনি গোড়ামী দেখাতেন না পাশাপাশি তিনি অনন্য নেতাও ছিলেন যে আর্থিক সঙ্কটে জীবন যাপন করার পরেও তিনি জনসাধারণের সম্পত্তি ও অর্থ চুরি করতে লোভ করেননি । নুরুদ্দিন জিনকি তার মেধা,চিন্তা ধার্মীকতা, নম্রতা, ন্যায়পরায়নতা, সততার জন্য আজীবন মুসলিমের মধ্যে বেঁচে থাকবন।


0 মন্তব্যসমূহ