সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

মুসলিম বীর যোদ্ধা ইমাদুদ্দিন জিনকি (পর্ব-২)



ইমাদুদ্দিন জিনকি

ইমাদুদ্দিন জিনকি সবসময় চাইতেন খ্রীষ্টান ক্রুসেডররা অতীতে যেই এলাকা গুলো মুসলিমদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলো তিনি সেগুলো মুক্ত করবেন। মসুলের শাসনভার গ্রহন করার পর তিনি তার প্রথম যুদ্ধ পরিচালানা জন্য আসারিব এবং হারিম শহর দুটোতে লক্ষ্য স্থির করেন। 

আসারিব ছিল ক্রুসেডরদের শক্তিশালী দূর্গ। আসারিবের ও তার আশেপাশের অঞ্চলের মুসলিমরা ক্রুসেডরদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি সর্বপ্রথম আসারিবকে টার্গেট করেন। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকির সাথীবর্গ ক্রুসেডরদের শক্তিদেখে তাকে উক্ত ইচ্ছা থেকে দূরে থাকতে বলেন ইমাদুদ্দিন জিনকি হার মানার পাত্র নন তিনি তার ইচ্ছায় অটল থাকেন। আসারিবে ইমাদুদ্দিন জিনকির থেকে অনেক শক্তিশালী এবং বড় বাহিণী অবস্থান করছিলো তিনি এসবের পরোয়া না করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এই প্রস্তুতির কথা জেরুজালেমের অধিপ্রতি ব্যালডন জেনে যান তিনি প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও পরে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরত্বের কথা জেনে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে একটি বাহিনী আসারিবের উদ্দেশ্যে প্রেরন করে। ইমাদুদ্দিন জিনকির গোয়েন্দা বিভাগ ছিল অনেক উন্নত তিনি ব্যালডনের পরিকল্পনার কথা যেনে যান। ইমাদুদ্দিন জিনকি সিদ্ধান্ত নেন ব্যালডনের বাহিনী আসারিবের পৌঁছার আগেই দফারফা করে নিবেন। ব্যালডনের বাহিনী আসারিবের উদ্দেশ্যে নিশ্চিত মনে এগিয়ে যাচ্ছিল তারা মনে ভাবছিলো সাধারন মসুলের শাসক তাদের কি এমনই বা করবে ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনী আসারিবের দেয়ালে মাথা ঠুকেই বিদায় নিবে। কিন্তু একরাতে আকস্মিত ব্যালডনের বাহিনীর উপর কেয়ামতের বিভীষীকা নেমে আসে ইমাদুদ্দিন তার পূর্ন শক্তি নিয়ে তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়েন । সাধারন মসুলের শাসকের এতবড় সিদ্ধান্ত আর শক্তি দেখে তারা কিংকর্তব্য বিমূড় হয়ে হয়ে পড়ে। তারপরেও ব্যালডনের বাহিনী তাদের পূর্ন্যশক্তি দিয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি কে আটকাবার চেষ্টা করে কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এবং তার বাহিনীর আক্রমনে তারা টিকতে না পেরে দিকবেদিক ছুটতে থাকে। উক্ত যুদ্ধে খ্রিষ্টানদের সংখ্যা এতই অধিক ছিল যে ইবনে খালেদুনের বর্ননা অনুযায়ী উক্ত মাঠে ৬০-৭০ বছর খ্রিষ্টানদের হাড্ডি কঙ্কাল দেখা যাচ্ছিলো।

ইমাদুদ্দিন জিনকি উক্ত যুদ্ধের পর আসারিবের দিকে যাত্রা শুরু করেন। আসারিবের কেল্লা একসময় মুসলিমদের থাকলেও ক্রুসেড যুদ্ধে তা মুসলিমদের হাতছাড়া হয়ে যায়। আসারিবের দূর্গের ভিতরে স্থানীয় সৈন্য ছাড়াও ইউরোপের বড় বড় দেশের সৈন্য বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এসবের পরোয়া না করে তার বাহিনী নিয়ে দূর্গের প্রাচীর ভেদ করে ভিতরের শত্রুদের কচুকাটা করে  দূর্গের বিজয় ছিনিয়ে আনেন। আসারিবের বিজয়ের পর তার সুখ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি ইউরোপীয় ক্রুসেডরদের ভয়ের কারন হয়ে দাড়ান। 

আসারিব বিজয়ের পরপরই ইমাদুদ্দিন জিনকি হারিমের উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং হারিম অবরোধ করেন। দূর্গের সৈন্যরা অনেক দিন প্রতিরোধ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা হার মেনে ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠায়। ইমাদুদ্দিন জিনকি শর্তারোপ করেন করেন হারিম এবং তৎপাস্ববর্তী এলাকা থেকে যা আয় হয় তার অর্ধেক মুসলিমদের খেরাজ হিসেবে আদায় করতে হবে। খ্রীষ্টানরা এই শর্ত মেনে নিলে ইমাদুদ্দিন জিনকি হারিম শহর থেকে অবরোধ তুলে নেন। 

আসারিব এবং হারিম দখল করার পর ইমাদুদ্দিন জিনকির মুসলিমদের অতীতে হারিয়ে হারানো এলাকা গুলো বিজয়ের উৎসাহ উদ্দীপনা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু এরপরে অনিচ্ছা সত্বেও তাকে জড়িয়ে পড়তে হয় গৃহযুদ্ধের কাদায়। এই গৃহ যুদ্ধে তিনি বাগদাদের খলিফার সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন এবং এই দ্বন্দ্বে তাদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। উক্ত যুদ্ধে ইমাদুদ্দিন জিনকি খলিফার কাছে পরাজয় বরন করেন। তিনি তার সৈন্যদের নিয়ে পালিয়ে তিকরিতের উপকন্ঠে  চলে আসেন পিছনে তাকে ধাওয়া করে এগিয়ে আসছিলো খলিফা এবং মালিক সালজুকের সৈন্যরা। অবস্থা বেগতিক দেখে ইমাদুদ্দিন জিনকির পিতা তিকরিতের শাসক সালাহুদ্দিন আয়ুবীর পিতা নাজিমউদ্দিন আয়ুবীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। নাজিউদ্দিন আয়ুবী নদী পার হওয়ার জন্যে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে সাহায্য করেন। এতে খলিফা নাজিমউদ্দিন আয়ুবীর উপর ক্ষুব্দ হয়ে নাজিমউদ্দিনকে তিকরিতের শাসক থেকে বরখাস্ত করেন। বরখাস্ত নাজিমউদ্দিন আয়ুবীকে ইমাদুদ্দিন জিনকি মসুলে আশ্রয় প্রধান করেন।

 কিছুদিন পর খলিফা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে শেষ করার উদ্দেশ্যে বিশাল এক বাহিণী মসুলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। খলিফার এহেন কান্ড দেখে ইমাদুদ্দিন জিনকি চিন্তিত হয়ে পড়েন তিনি চাইছিলেন না আর কোন গৃহযুদ্ধ বাধুক। তিনি চাইছিলেন না তার হাতে আর কোন স্বজাতী ভাইয়ের রক্ত ঝরুক তখন তিনি তার তীক্ষ্ণবুদ্ধি এবং বিচক্ষনতার পরিচয় দেন। তিনি সৈন্য বাহিনীকে দুটি বাহিনীতে ভাগ করেন এক ভাগ সেনাপতি নাসিরের অধীনে রেখে তাদের শহরের ভিতরে অবস্থান করতে বলেন। আরেক ভাগ নিয়ে সুলতান সানজারের সাহায্যে ইমাদুদ্দিন জিনকি খলিফার বাহিনীকে এমনভাবে অবরোধ করলেন যে খলিফার কাছে প্রয়োজনীয় রসদ পৌঁছা বন্ধ হয়ে যায়। এতে খলিফার সেনাবাহিনীতে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। ইমাদুদ্দিন জিনকি তখন চাইলেই খলিফার এই দুর্বল সেনাবাহিনীকে এক নিমিষেই শেষ করে দিতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেন নি তিনি চাইছিলেন খলিফা যাতে তার বাহিনী নিয়ে যেদিক থেকে এসেছে সেই দিকেই ফিরে যায়। খলিফার শিবিরে খাদ্য সংকট প্রকট আকারে দেখা দিলে তিনি উপায় না দেখে বাগদাদে ফিরে যান।

মুসলিম বীর যোদ্ধা ইমাদুদ্দিন জিনকী (পর্ব-১)  মুসলিম বীর যোদ্ধা ইমাদুদ্দিন জিনকি (পর্ব-৩)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ