সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

মুসলিম বীর যোদ্ধা ইমাদুদ্দিন জিনকি (পর্ব-১)

ইমাদুদ্দিন জিনকি


ইতিহাসে যে কজন মুসলিম বীর যুদ্ধাদের নাম শুনা যায় ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমান,সত্যনিষ্ঠ ও ন্যায়বিচারক শাসক। তিনি তার কর্মকর্তাদের উপর কড়া নজর রাখতেন যাতে তারা অন্যায়ভাবে স্থাবর সম্পদ গড়ে তুলতে না পারেন। তার শাসন ব্যাবস্থা মুসলিম অমুসলিম সবার জন্য সমান ছিলো। তিনি উদার মনের মানুষ ছিলেন  প্রত্যেক জুম্মার আগে ১০০ দিনার করে দান করতেন। এবং তিনি সব সময়  তার রজ্যের গরীব দুঃখী মানুষের প্রতি আন্তরিক দৃষ্টি রাখতেন।

ইমাদুদ্দিন জিনকি জম্ম গ্রহন করেন ১০৮৫ ঈসায়ী সালে মৃত্যুবরন করেন মৃত্যুবরন করেন ১৪ সেপ্টেম্বর ১১৪৬ ঈসায়ী সালে সিরিয়ার একটি শহর কালাত আল জাবারে। তিনি মসুলের শাসন কার্যে নিযুক্ত হন ১১২৭ ঈসায়ী সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মসুলের শাসক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। সাধারন মসুলের শাসক থেকে তিনি তার সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে যান যা জেঙ্গি সম্রাজ্য নামে পরিচিত। তিনি ইমাদ  আল-দীন জেঙ্গি নামেও পরিচিত।

সুলতান ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন মালিক শাহর প্রিয় সৈন্য আক সুনকুর আল হাজিব ওরফে কাসিমুদ্দৌলার সন্তান। সুলতান মালিক শাহ কাসিমুদ্দৌলাকে অনেক ভালোবাসতেন ।ঐতিহাসিক সূত্রমতে কাসিমুদ্দৌলা খুব ভালো শিক্ষক ছিলেন এবং ধার্মিকও তিনি মধ্যরাতেরও সালাত ও কায়েম করতেন। মালিক শাহ প্রথমে কাসিমুদ্দৌলাকে রাজপ্রাসাদের দায়িত্ব দেন এবং পরে হালাবার গভর্নর নিযুক্ত করেন। কাসিমুদ্দৌলা হালাবার গভর্নর থাকাকালীন আরেক শাসক তাজদ্দৌলার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তাজউদ্দৌলা কাসিমুদ্দৌলাকে যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং তাকে গ্রেফতার করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেন। 

কাসিমুদ্দৌলার ইন্তেকালের সময় সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির বয়স ছিলো ১২ কিংবা ১৪ বছরের মাঝামাঝি। তিনি যুদ্ধের ময়দানেই ছিলেন যখন তার বাবার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিলো তখন তিনি সেখান থেকে পালিয়ে বারকিয়ারুকের দরবারে চলে আসেন। এরপর তাজদ্দৌলার সাথে বারকিয়ারুকের সাথে যত গুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয় তিনি বারকিয়ারুকের সাথেই থাকেন । এরপর কারবুকার অনুরোধে ইমাদুদ্দিন জিনকি কারবুকার কাছে চলে আসেন। কারবুকা ছিলেন ইমাদুদ্দিন জিনকির পিতা কাসিমুদ্দৌলার ঘনিষ্টতম বন্ধু। কারবুকার কাছেই ইমাদুদ্দিন জিনকি উত্তম শিক্ষা দীক্ষা নিয়ে বড় হন। একসময় কারবুকা ইমাদুদ্দিন জিনকি কে একটি সৈন্য দলের সেনাপতি করে তার সাথে যুদ্ধে নেন । উক্ত যুদ্ধে কারবুকা সৈন্যদল থেকে আলাদা হয়ে শত্রুদের মাঝে ঢুকে পড়েন কারবুকা তখন ধরেই নিয়েছিলো তার মৃত্যু অবাধারিত কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি ক্ষিপ্র গতিতে সেখানে উপস্থিত হয়ে শত্রুদের মধ্যে থেকে কারবুকাকে উদ্ধার করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকির এমন বিরত্ব দেখে কারবুকার উৎসাহ উদ্যম বৃদ্ধি পায় তিনি তাকে নিয়ে আমেল শহর আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেন। তারা সেখান থেকে আমেল শহরে পৌঁছে আমেল শহর আক্রমন করে তা বিজয় করেন। কিছুদিন পর কারবুকা ইন্তেকাল করলে তিনি  জারকামিস এর কাছে চলে আসেন।

জারকামিশ ইমাদুদ্দিন জিনকি কে আগেই থেকেই পছন্দ করতেন তিনি তার ছেলের মেয়ের সাথে ইমাদুদ্দিন জিনকি কে বিয়ে দেন। কিছুদিন পর জারকামিশ থেকে মওদুদ মসুলের শাসনভার বিজয়লাভ করে। মওদুদ ও ইমাদুদ্দিন জিনকি কে অনেক পছন্দ করতেন তিনি তার বাহিনীতে ইমাদুদ্দিন জিনকি কে নিযুক্ত করেন। সেই সময় মুসলিম শাসকদের মধ্যে ভাতৃত্বের বন্ধন ছিলো দূর্বল তারা একে অন্যের উপর প্রভাব বিস্তারে ব্যাস্ত ছিলো। সেই সুযোগে ইউরোপীয় খ্রীষ্টান ক্রুসেড বাহীনী মুসলিমদের অনেক এলাকা দখল করতে থাকে যেমন উদায়াসা, এন্তাকিয়া, বায়তুল মাকদিস, আরসুক, মারিম, তাবরিয়া, বানিয়াত ইত্যাদি। এসব অঞ্চলে টেম্পলার আর হসপিটেলর মিলে মুসলিমদের উপর নানাবিদ অত্যাচার চালাতো। 

তখন কোন মুসলিম শাসক ক্রুসেডরদের ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোন টু-শব্দ ও করতো না। কিন্তু আমীরে মওদুদ ছিলেন ব্যাতিক্রম তিনিই সর্বপ্রথম ক্রুসেডরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন। আমীরে মওদুদ ইমাদুদ্দিন জিনকি কে সাথে নিয়ে তার শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকেন। যেখানে ইরাক,ইরান,শামের শক্তিধর শাসেকরা চুপ ছিলো সেখানে সাধারন মসুলের শাসক আমীর মওদুদ এবং ইমাদুদ্দিন জিনকি মিলে সর্ব প্রথম খ্রীস্টান ক্রুসেডরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালানা করেন। তারা সর্ব প্রথম সিজিস্তানে আক্রমন করে সিজিস্তান শত্রু মুক্ত করেন করেন। এরপর তারা উদায়াসার দিকে অগ্রসর হন। উদায়সা শহরের নিকট আমীরে মওদুদ ও ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর সাথে ক্রুসেডরদের তুমুল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধেও আমীরে মওদুদ এবং ইমাদুদ্দিন জিনকি বিজইয়ে ছিনিয়ে আনেন। উদায়াসাকে দখল মুক্ত করার পর তারা তিবরিয়ার দিকে অগ্রসর হন। তিবরিয়াতেও মওদুদ ও ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনী বিরত্বের সাথে ক্রুসেডরদের পরাজিত করে তিবরিয়া দখল মুক্ত করেন। উক্ত যুদ্ধগুলোর ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরত্বের কথা চারদিকে চড়িয়ে পড়ে। কিছুদিন পর নামাজরত অবস্থায় হাসাসীন রা আমীরে মওদুদকে হত্যা করে।  

তার পর মসুলের দায়িত্ব গ্রহন করেন বারসাকি । সুলাতান মাহমুদ ইমাদুদ্দিন জিনকি কে বারসাকির নায়েব হিসেবে নিযুক্ত করেন। বারসাকিও আমীরে মওদুদ এর মত খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রস্তুতি নিতে থাকেন। বারসাকি এবং ইমাদুদ্দিন জিনকি সিমসাত মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সিমসাতের অভিমুখে যাত্রা করেন। সিমসাতে ইমাদুদ্দিন জিনকি বিরত্বের সহিত যুদ্ধ করে সিমসাত শত্রু মুক্ত করেন। উক্ত যুদ্ধে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরত্ব দেখে সুলতান মাহমুদ ইমাদুদ্দিন জিনকি কে বসরার অধিপতি বানিয়ে দেন। কিছু দিন পর মসুলের শাসক বারসাকি ইন্তেকাল করলে বারসাকির অবস্থা নাজুক হয়ে উঠে অতঃপর দুইজন আলেমের অনুরোধে সুলতান মাহমুদ ইমাদুদ্দিন জিনকি কে মসুলের শাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন।

মসুলের পাশ্ববর্তী এলাকা গুলো তখন ক্রসেডরদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিলো। তাই মসুলের সবাই ইমাদুদ্দিন জিনকির মত শাসকের অপেক্ষা করছিলো। ইমাদুদ্দিন জিনকি মসুলের শাসনভার গ্রহনের পরপরই মসুলের শাসন ব্যাবস্থা এবং ওইসব আমিরদের দিকে নজর দেন যারা নিজেদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করছিলো। তিনি সবসময় মুসলিমদের নিরাপত্তার কথা ভাবতেন মুসলিমরা যেখানেই বিপদে পড়তো তিনি যথাসাধ্য সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। শুনা যায় তিনি বলতেন কোমল বিচানা অপেক্ষা ঘোড়ার পিঠ, হৃদয়কাড়া সূরের মূর্চনা অপেক্ষা ঘোড়ার পিঠা অপেক্ষা যুদ্ধের শোরগোল, সুন্দরী লনাদের মিষ্টি কন্ঠের চেয়ে ঝনঝনানি আমার কাছে অধিক প্রিয়। সেই সময়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির নাম শুনলেও শত্রুরাও থর থর করে কাপতো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ