সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

মুসলিম বীর যোদ্ধা নুরুদ্দিন জিনকি (পর্ব-৩)

 

মুসলিম বীর যোদ্ধা নুরুদ্দিন জিনকি (পর্ব-৩)

অন্যদিকে ১২ আগস্ট ১১৬৪ মসুলের আমীর কুতুবদ্দিন মওদুদ আর্টকুইট শাসক ফখরুদ্দিন ওরা আরসলান (হিসান কেইফার আমীর) এবং নাইমউদ্দিন আলপি (মারডিনের আমির) এর সহযোগিতায় ৭০ হাজার অশ্বারোহী এবং ৪০ হাজার পদাতিক সৈন্য জড় করেন এবং হারিম অবরোধ করেন। এই দূর্গ এন্টিওকের প্রতিরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ন ছিলো সেন্ট ভ্যালারি রিনাল্ড এন্টিওক রাজ্যের সিমানায় থাকা ফ্রাঙ্কের কাছে সাহায্য চান। ভ্যালারির সাহায্যে সাড়া দিয়ে এন্টিওকের প্রিন্স বোহেমন্ড তৃতীয়, ত্রিপোলির কাউন্ট রেমন্ড তৃতীয়,  বাইজেইন্টাইন গভর্নর কনস্ট্যান্টাইন কালামোনস, আর্মেনিয়ার লর্ড থোরাস এবং এডেসার কাউন্ট তৃতীয় জোসেলিন মিলে ১৩ হাজার সৈন্য জড় করে এবং হারিমকে সাহায্য করার জন্য দ্রুত ছুটে আসে। 

যখন নুরুদ্দিন জিনকি তার ভাই কুতুবদ্দিন মওদুদ সাথে যোগ দেন তখন সবাই অবরোধ তুলে ফিরে যাচ্ছিলো (অনেকের মতে এইটা নুরুদ্দিনের কৌশল ছিলো)। খ্রীষ্টানদের উৎসাহ উদ্যম তখন ছিলো তুঙ্গে কারন তারা ইতিমধ্যে আল বুকাইয়ার যুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিলো তারা আর্মেনিয়ার লর্ড থোরিসের পরামর্শ উপেক্ষা করে নুরুদ্দিন জিনকি এবং কুতুবদ্দিন মওদুদের পিছনে দাওয়া করে আর্তাহ এর কাছে পৌছায়।  আর্তাহ তে নুরুদ্দিন জিনকি ও কুতুবদ্দিনের বাহিনী পাল্টা আক্রমন করে তাদেরকে জলাভূমি দিকে ঠেলে দেয় এবং  এক অবিশ্বাস্য বিজয় লাভ করে। এই যুদ্ধে ১০ হাজার খ্রীষ্টান সৈন্য নিহত হয় এবং সকল নেতাদের বন্দি করা হয় শুধুমাত্র আর্মেনিয়ার লর্ড থোরেস ছাড়া তিনি যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে সফল হন।  এন্টিওকের যুবরাজ বোহেমন্ড তৃতীয়, ত্রীপলির কাউন্ট রেমন্ড তৃতীয়, বাইজাইন্টাইন গভর্নর কনস্ট্যান্টাইন কলোমানোস এবং লুসিগানের হিউকে শিকল বেঁধে আলোপ্পোতে প্ররন করা হয়।  

ক্রুসেডরদের আরতাহ তে হারানো পর নুরুদ্দিন জিনকি হারিমে ফিরে আসেন এবং তা নিয়ন্ত্রনে নেন এবং কিছু দিনের মধ্যে বানিয়াস ও বিজয় করেন এই শহরগুলো ১১৪৯ থেকে খ্রীষ্টানদের দখলে ছিল। নুরুদ্দিন জিনকিকে সকলে  পরামর্শ সত্ত্বেও তিনি এনন্টিওক আক্রমন করেন নি করেন নি কোন এক কারননে। জেরুজালেম এর রাজা আমরাল্রিক দ্বিতীয় যখন দেখলো নুরুদ্দিন জিনকি হারিম এবং বানিয়াস দখল তখন তিনি শিরকুহ এর উপর অবরোধ তুলে নিয়ে মিশর ত্যাগ করে। এরপরে আমাল্রিক দ্বিতীয় বানিয়াসে আক্রমন করেন কিন্তু তার এই চেস্টা নুরুদ্দিন জিনকির বাহিনী ব্যার্থ করে দেয়। কিছুদিন পর নুরুদ্দিন জিনকি  এন্টিওকের রাজপুত্র এবং সিলিসিয়াসের গভর্নর কনস্টাইনকে স্বাধীন করে দেন। মুক্তিপন এবং প্রচুর মুসলিম বন্দীদের মুক্তির বিনিময়ে নুরুদ্দিন জিনকি বোহেমন্ড তৃতীয় কে মুক্তি দিয়েছিলেন। আমাল্রিক নুরুদ্দিন জিনকিকে অনুরোধ করেন যাতে ত্রিপলির কাউন্ট এবং চার্টিলনের রেইনল্ড কে যাতে মুক্ত করা হয় কিন্তু নুরুদ্দিন জিনকি তাতে অস্বীকৃতী জানান। 

পুরোনো বেঈমানীর প্রতিশোধ নিতে নুরুদ্দিন জিনকি জানুয়ারির ১১৬৭ সালে শিরকুহ প্রধান করে আবার একটি বাহিনী প্রেরন করেন এই  যুদ্ধেও নুরুদ্দিন জিনকির অনুরোধে সালাউদ্দিন আয়ুবী তার মামার সঙ্গ দেন। এই অভিযানের কথা জানতে পেরে শাওয়ার দ্রুত রাজা আমাল্রিক এর কাছে সাহায্য চান রাজা আমাল্রিক মরুভূমির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় শিরকুহ কে ধরার জন্য একটি বাহিনী প্রেরন করেন কিন্তু ব্যার্থ হন । মরুভূমির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় শিরকুহ মারাত্মক এক মরু ঝড়ের কবলে পড়েও  গিজায় শিবির স্থাপন করতে সক্ষম হন (গিজা ছিল মিশরের রাজধানীর উত্তরের একটি শহর)। শিরকুহ গিজাতে ৫০ দিন অতিবাহিত করার পর করার পর শাওর কাছে প্রস্তাব পাঠান তিনি যেনো নুরুদ্দিন জিনকির সাথে যোগ দেন এবং ফ্রাঙ্কদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেন কিন্তু শাওর আমাল্রিক এর সাথে থাকার জন্য এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। আমাল্রিক তখন শফথ নেন শিরকুহকে মিশর থেকে ত্যাগ না করা পর্যন্ত তিনি মিশর ত্যাগ করবেন না।  এই সময় শিরকুহ শাওরের বিরুদ্ধে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়াতে থাকা সুন্নি মুসলিমদের সমর্থন পেয়েছিলেন। 

অবশেষে শিরকুহ শাওর বীরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন শিরকুহ তুর্কিদের প্রাচীন সামরিক কৌশল অবলল্বন করে তার বাহিনী কে তিনটি বাহিনীতে বিভক্ত করেন। শিরকুহ জানতেন ক্রুসেডররা সর্বপ্রথম মূল বাহিনীতেই আক্রমন করবে তাই তিনি মূল বাহিনীর সংখ্যা কমিয়ে সালাউদ্দিন কে তার নেতৃত্ব দেন যাতে মূল বাহিনী জনাকির্ন দেখায়। ১৮ই মার্চ ১১৬৭ সালে আমাল্রিক ও ফাতেমিদের মিত্র বাহিনী বাবাইনে সালাউদ্দিন বাহিনীর উপর আক্রমন চালায় সালাউদ্দিন সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষ করে পরিকল্পনা অনুসারে পশ্চাদপসরন করেন আমাল্রিক একদল বাহিনী নিয়ে তার পিছনে ধাওয়া করে। অন্যদিকে শিরকুহ সংকেত পেয়েই তার বাহিনী নিয়ে এসে পিছনে থাকা ফাতেমী এবং আমাল্রিক এর মিত্র বাহিনী ধ্বংস করে দেয়। শিরকুহ জোড়ালো আক্রমন দেখে সালাউদ্দিন আমাল্রিকের বাহিনীর উপর পাল্টা আক্রমন করে এবং আমাল্রিকের বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। এই যুদ্ধে থাকা মিত্র বাহিনীর বেশির ভাগ সৈন্য নিহত হয় আমাল্রিক এবং শাওর তাদের বেঁছে থাকা কিছু সৈন্য নিয়ে কায়রো পালিয়ে যায়।   

এই বিজয়ের পর শিরকুহ আলেকজান্দ্রিয়া নিয়ন্ত্রনে নেয় সেখানে থাকা সুন্নি মুসলিমরা শিরকুহকে বিজয়ের অভর্থনা দেয় । লজ্জাজনক হারের পরও কিছুদিনের মধ্যে মিত্র বাহিনী আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধ করে কারন মিশরে তখনও শিরকুহর সৈন্য সংখ্যা থেকে মিত্র বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা বেশী ছিলো।   তিন মাসের অবরোধের ফলে আলেকজান্দ্রিয়া  শহরে খাদ্য সংকট সহ বিভিন্ন সংকট দেখা দেয় তাই শিরকুহ  এই শর্তে শাওররের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে রাজি হন যে ফ্রাঙ্করা মিশরে থাকতে পারবে না এবং জনগনগনকে কোন প্রকার শাস্তি প্রধান করা যাবে না। এই অবরোধের জন্য নুরুদ্দিন জিনকি ফ্রাঙ্কদের ভূমিতে আক্রমন করছে শুনে আমাল্রিকও শিরকুহর এই শর্ত মেনে নেয়। ৪ আগস্ট ১১৬৭ সালে শাওর ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পর তিনি মুসলিম এবং ফ্রাঙ্কদের ক্ষতিপূরন প্রধান করলে উভয় দল মিশর ত্যাগ করে। শাওর ক্রুসেডরদের সাথে চুক্তির বাতিল করার জন্য ১০০,০০০ হাজার স্বর্ন মুদ্রা শ্রদ্ধা হিসেবে প্রধান করেন এবং  মিশর ত্যাগ করা আগে আমাল্রিককে ইবেলিনের বালিয়ানের কমান্ডে কাইরোর থাকতে দেন আমাল্রিক মিশর থেকে গেলেও ক্রুসেডররা সেখানে থেকে যায়। 


মুসলিম বীর যোদ্ধা নুরুদ্দিন জিনকি (পর্ব-২)

মুসলিম বীর যোদ্ধা নুরুদ্দিন জিনকি (পর্ব-৪)


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ