সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

মুসলিম বীর যোদ্ধা নুরুদ্দিন জিনকি (পর্ব-২)ঃ সালাহউদ্দিনের উত্থান

মুসলিম বীর যুদ্ধা নুরুদ্দিন জিনকি (পর্ব-২)ঃ সালউদ্দিনের উত্থান

নুরুদ্দিন জিনকি ভূমিকম্পের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ দূর্গগুলি দ্রুত মেরামত করতে থাকলেন একই সময়ে তিনি তার সেনাবাহিনী সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকলেনে এতে তিনি ফ্রাঙ্কদের সম্ভাব্য আক্রমন  রুখে  দিতে সফল হন। কিছুদিনের মধ্যে ক্রুসেডররা নুরুদ্দিন জিনকি বিরুদ্ধে বাইজাইন্টাইন সম্রাজ্যের সাথে জোট করলো। ম্যানুয়েলকে সাথে নিয়ে তারা বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে বের হয় তারা প্রথমে আর্মেনীয় দেশগুলোকে টার্গেট করলো। ম্যানুয়েল প্রথমে সিলিশিয়ান শহর দখল করেন পরে এন্টিওকের যুবরাজ চর্টিলেনের রেইনল্ড কে শাস্তি প্রধান করেন যুবরাজকে শস্তি দেওয়ার কারন হলো সে আর্মেনীয়দের সাথে সাইপ্রাস দ্বীপে আক্রমন করে লুঠপাট করতো সেই দ্বীপ ছিল বাইজান্টাইন রাজা ম্যানুয়েলের অধীনে। ১২ এপ্রিল ১১৫৯ সালে ম্যানুয়েল বাহিনী এন্টিওকে প্রবেশ করে তারা সেখানে একদিন অতিবাহিত করার পর আলেপ্পোর উদ্ধেশ্যে রওনা দেয়। একদিন পদযাত্রার পর তারা আলেপ্পোর বালন নামক একটি স্থানে এশে থামলো। নুরুদ্দিন জিনকি বাইজাইন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েলের কাছে প্রস্তাব পাঠান তিনি সকল খ্রীষ্টান কে মুক্ত করে দিবেন ম্যানুয়েল যেনো ফিরে যান। একই সময় সেলজুক সুলতান ম্যানুয়েলের বিরুদ্ধে জেরুজালেমে ষড়যন্ত্র করছিলো তাই ম্যানুয়েল কোন উপায় না দেখে নুরুদ্দিন জিনকির প্রস্তাব মেনে নেন এবং জেরুজালেমের দিকে যাত্রা শুরু করেন  নুরুদ্দিন জিনকির উপর আক্রমন না করায় ক্রুসেডররা ম্যানুয়েলের উপর ক্ষীপ্ত হয়ে উঠে।বস্তুত প্রস্তাবটি বাইজাইন্টাইন সম্রাটের পক্ষেই ছিলো তিনিও মন থেকে এই অঞ্চলের ক্ষতি করতে চাননি। উক্ত প্রস্তাব মোতাবেক নুরুদ্দিন তার বন্দীতে থাকা ৬ হাজার খ্রীষ্টানকে মুক্ত করে দেন এদের মধ্যে টেম্পলার মাস্টার ব্যালার্সফোর্ড ও ছিলো। ক্রুসেডররা বাইজাইন্টাইন সম্রাটের উপর ক্ষীপ্ত হলেও তারা নুরুদ্দিন জিনকির বিপক্ষে বাইজাইন্টাইনদের উপরই নির্ভরশীল ছিলো। 

এদিকে ফ্রাঙ্করা ভয়েছিলো নুরুদ্দিন জিনকি দামেস্ক জয় করার পর না জানি মিশরের দিকে এগোয় কারন তখন মিশরের জন্য অন্যতম হুমকি ছিলো নুরুদ্দিন জিনকি কারন ফ্রাঙ্ক চাইছিলোনা ফাতেমিদের পরে নুরুদ্দিন জিনকি মিশর শাসন করুক। তাই ক্রুসেডররা মিশর আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তারা মিশরে যাওয়ার রাস্তা  পরিস্কার করার জন্য ১১৫৩ সালে আস্কালন বিজয় করে। এবং সদ্য জেরুজালেমের সিংহাসনে বসা আমরাল্রিক প্রথম মিশর আক্রমন করার আশংকা আরো বাড়িয়ে দেন কারন তিনিও চাইছিলেন মিশরকে দখল করতে। এদিকে ফাতেমিরা ছিলো রাজনৈতিক জটিলতায় জর্জরিত তারা তারা এর সমাধানের জন্য নুরুদ্দিনের দিকে এগোচ্ছিলো মূলত সোজা বাংলায় বলতে গেলে নুরুদ্দিন জিনকি এবং ক্রুসেডররা দুই দল ই চাইছিলো মিশর দখল করতে আর মাইনকা চিপায় ছিলো ফাতেমিরা। ১১৬৩ সালে জেরুজালেমের রাজা মিশরের দিকে যাত্রা করেন এবং পেলিসিয়াম শহর অবরোধ করেন। পেলিসিয়াম শহরে ফাতেমি কমান্ডার দিরগাম বন্যা সুযোগ নিয়ে নীল নদীর কয়েকটি দরজা খুলে দেন এতে ক্রুসেডরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এদিকে সাবেক উজির শাওর যে দিরগামের সাথে ক্যাচালের ফলে তার অবস্থান হারিয়েছিলেন তিনি সাহায্যর জন্য নুরুদ্দিন কাছে এসেছিলেন তার অবস্থান ফিরে পেতে তাকে সাহায্য করার জন্য এর বিনিময়ে তিনি নুরদ্দিন জিনকির সকল সৈন্যর ব্যয় খরচ তিনি বহন করবেন এবং মিশর থেকে প্রাপ্ত দুই তৃতীয়াংশ কর তাকে দিবেন বলে প্রতুশ্রুতি দেন। ফাতেমিরা তখন ছিলো বিভক্তির মূল কারন মূলত খলিফা এদের রাস্ট্র প্রধান হলেও  গভর্নররা  তাকে মান্য করতো না গভর্নররা ছিলো তাদে মধ্যে প্রতিযোগিতায় ব্যাস্ত এই গভর্নরা প্রায়ই সহিংস কান্ড গঠাতো তাই  নুরুদ্দিন জিনকিও হয়তো চাইছিলেন ফাতেমিদের ক্ষমতার অবসান করতে। 

এর মাধ্যমে নুরদ্দিন জিনকি তার সর্বাধিক আস্থাভাজন সেনাপতি শিরকুহর নেতৃত্বে বিশাল সেনাবাহিনী মিশরে প্রেরন করেন। এই সেনাবাহিনীতে শিরকুহর ভাগ্নে ২৭ বছরের সালাহউদ্দিন আল আয়ুবীও যোগ দেন। এদিকে ক্রুসেডররা যাতে এই ক্যাচালের সুযোগ নিতে না পারে এবং শিরকুহ যাতে দ্রুত মরুভূমি পেরিয়ে মিশরে যেতে পারে তার জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ নুরুদ্দিন জিনকি নিচ্ছিলেন। নুরুদ্দিন জিনকি ফ্রাঙ্কদের ব্যাস্ত রাখতে বানিয়াসে আক্রমন করেন। এদিকে দিরগাম কোন উপায় না দেখে কিছুদিন আগে আক্রমন করা জেরুজালেমের রাজার কাছেই সাহায্য চান (বিষয়টা কেমন না এতেই বুঝা যাচ্ছে দিরগামের সাথে জেরুজালেমের যোগসূত্র ছিলো আর জেরুজালেমের রাজা  দিরগাম কেই রাখতে চাইছিলো যেনো তাকে সরিয়ে মিশর দখল করতে পারে) জেরুজালেমের রাজা আম্রালিক প্রথম এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার আগেই শিরকুহ দিরগামের ভাইয়ের নেতৃত্বে পেলুসিয়ামের নিকট একটি বাহিনীকে পরাজিত করে। অবশেষে ১১৬৪ দিরগামের মৃত্যুর পর শাওর তার উজিরের পদ ফিরে পান। শাওর ছিলেন  একজন কুচক্রী লোক এর আগেও তিনি ক্ষমতায় থাকা কালীন অনেক ফাতেমিদের নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন এবং তার অনেক অংশীদারকেও হত্যা করছিলেন  এমনকি তার রাজধানী ফুসতাত কেও জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে শত্রুরা সেই শহর না পায়  এমন কর্মকান্ড দেখে দিরগাম তাকে বরখাস্ত করেছিলেন।

এদিকে শাওর ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পর চুক্তি লঙ্গন করে নুরুদ্দিন জিনকি সেনাপতি শিরকুহ কে মিশর ত্যাগ করতে বলেন শিরকুহ শাওর এর এমন কর্মকান্ড দেখে এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে তিনি বিলবাইসকে আক্রমন করে তা দখল করে নেন। এই শাওর মূহুর্তে জোট বদলের জন্য কুখ্যাত ছিলেন তিনি শিরকুহ কে দমানোর জন্য জেরুজালেম এবং ক্রুসেডরদের সাথে জোট করেন। শাওর ক্রুসেডরদের কাছে থেকে শিরকুহর বিরুদ্ধে সামরিক সাহয্য চান এর বদলে এই অভিযানের প্রতিটি মারহালার জন্য এক হাজার দিরহাম এবং নাইটস এবং হসপিটালের ঘোড়ার খাদ্য ব্যয় বহন, এবং আরো দামী উপহার দিবেন বলে চুক্তিবদ্ধ হন (মারহালা তখনকার সময়ের রাস্তার দূরত্ব বুঝানো হতো আর জেরুজালেম থেকে নীল নদ পর্যন্ত ছিল ২৭ মারহালা)।  কিছুদিনের মধ্যে ফাতেমী এবং ক্রুসেডর মিত্র বাহিনী বিলবাইসকে অবরোধ করে।

এদিকে নুরুদ্দিন জিনকি জেরুজালেমের রাজা আমাল্রিককে মিশর ত্যাগ করার জন্য ফাঙ্কের ভূমিতে আক্রমন করেন কারন তিনি সরাসরি শিরকুর কাছে যেতে পারছেন যেতে হলে খ্রীষ্টানদের সিমানা দিয়ে যেতে হবে ।নুরুদ্দিন জিনকির রাজ্য সিরিয়া থেকে  মিশরের পথে ছিলো লিবিয়া তা ছিলো খ্রীষ্টানদের দখলে। তিনি সিরিয়া থেকে বেরিয়ে লিবিয়াতে আক্রমন করেন এই যুদ্ধ আল বুকাইয়া যুদ্ধ নামে পরিচিত যা ১১৬৩ সালে সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে জেরুজালেম সম্রাজ্য, বাইজাইন্টাইন এম্পায়ার, প্রিন্সপালিটি অফ এন্টিওক, কাউন্টি অফ ত্রিপলি একত্রিত হয়ে যৌথ বাহিনী গঠন করে নুরুদ্দিন জিনকিকে আক্রমন করে । তাদের এমন যৌথ আক্রমনে নুরুদ্দিন জিনকির বাহিনী কিংকতব্যবিমূড় হয়ে যায় এবং নুরুদ্দিন জিনকি বাহিনী পরাজয় করে। এই যুদ্ধে নুরুদ্দিন জিনকি প্রায় মরতে মরতে বেচেঁ যান। এই বিজয়ের ফলে খ্রীষ্টানদের আত্মবিশ্বাস কয়েক গুনে বৃদ্ধি পায়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ