সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

মুসলিম বীর যোদ্ধা ইমাদুদ্দিন জিনকি (পর্ব-৩)

 

ইমাদুদ্দিন জিনকি

গৃহ যুদ্ধ থেকে বের হয়েই ইমাদুদ্দিন জিনকি দ্রুত তার সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকেন। ইমাদুদ্দিন জিনকির ৫২৪ হিজরীতে আসারিব ও হারিম বিজয়ের পর গৃহযুদ্ধে তার ১০ বছর কেটে যায়। মুসলিম বিশ্ব যখন গৃহ যুদ্ধের কাদায় এই সময় ইউরোপীয় ক্রুসেডররা আরেকবার ক্রুসেড যুদ্ধের ঘোষনা দেয় এই যুদ্ধের কারন হলো মুসলিমদের কোন্দলের সুযোগ নেওয়া এবং আগের হারানো দুটি শহরের প্রতিশোধ নেওয়া। 

এই গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতির মধ্যেই রোমের কায়সার এবং ফ্রান্সের বাদশাহ নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে মুসলিম এলাকায় আক্রমন করে ক্রুসেডের সূত্রপাত ঘটায়। এই যৌথ বাহিনী প্রথমেই মুসলিম শহর বাজা শহর দখল করে। শহর দখল করার পর তারা  সেখানকার সকল পুরুষ হত্যা করতো এবং নারী ও শিশুদের দাস বানিয়ে নিত। বাজা দখলের পর ক্রুসেডরদের উৎসাহ উদ্যম আরো বেড়ে যায় তারা ভেবে নেয় গৃহযুদ্ধের ফলে সত্যিই মুসলমানরা নুইয়ে পড়েছে। বাজা দখলের পর ৫৩৪ হীজরিতে ক্রুসেডররা সিজার দখল করে। সিজারের শাসক ছিল আবু আসাকির একজন দূত পাঠিয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। আবু আসকির ছিলেন আরেক বুদ্ধিদীপ্ত শাসক যখনই ক্রুসেডররা তার দূর্গে আক্রমন করতো তখনি তিনি তার সৈন্যদের নির্দেশ দিতেন ক্রুসেডরদের উপর তীর, গরম পানি, পাথর নিক্ষেপ করতে। এইভাবেই কিছুদিন আবু আসাকির ক্রুসেডরদের প্রতিরোধ করতে থাকেন। ওই দিকে আবু আসাকির এর দূত ইমাদুদ্দিনক জিনকির দরবারে গিয়ে ক্রুসেডররা যে বাজা দখল এবং সিজার অবরোধ করেছে তা বর্ননা করে শুনায়। এইসব কথা শুনা মাত্রই ইমাদুদ্দিন জিনকির রক্ত টগবগিয়ে উঠে। তিনি দূত এইবলে বার্তা পাঠান  তুমি আবু আসাকিরকে বলবে সে যেন সিজার উপকন্ঠের দিকে নজর রাখে যখনই আকাশে অগ্নিযুক্ত তীর দেখতে পাবে তখনই বুঝবে আমি পৌঁছে গেছি সে যেন তার বাহিনী নিয়ে শহরের বাইরে এসে আক্রমন করে দ্বিমুখী আক্রমনে ক্রুসেডরদের অবস্থা কি হয় তা পুরো বিশ্বদেখবে। অতঃপর সেই রাত আসলো ক্রুসেডররা থেমে থেমে শহর প্রাচীরে আক্রমন করে যাচ্ছিলো। সিজার ছিল মুসলমানদের শক্তিশালী কেল্লা আবু আসাকির তার ছোট বাহিনী নিয়ে কেল্লার ভিতর থেকে কোন রকম প্রতিরোধ করে যচ্ছিলো। তিনি অস্থির হয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ আকাশে অগ্নিযুক্ত তীর দেখে তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেন। আবু আসাকির তার বাহিনী কে দুইভাগ করে একভাগ কে তিনি প্রাচীরের উপরে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন আরেক ভাগ নিয়ে তিনি শহরে দরজার দিকে রওনা দেন। ক্রুসেডররা নিশ্চিত মনে আক্রমনে করে যাচ্ছিলো তারা ভেবেছিলো মুসলিমদের শক্তি গৃহযুদ্ধের ফলেই নষ্ট হয়ে গেছে। হঠাৎ আল্লাহুয়াকবার ধ্বনি তে পুরো এলাকা কম্পিত হয়ে উঠে। ইমাদুদ্দিন জিনকি ক্ষিপ্র গতিতে ক্রুসেডরদের উপর হামলে পড়েন। ইমাদুদ্দিন জিনকি এক দিক থেকে আবু আসাকির একদিক থেকে তাদের আকাশ কুশুম কল্পন নসাৎ করে দিতে থাকেন। ইমাদুদ্দিন ও আসাকিরের দ্বিমুখী আক্রমনে ক্রুসেডররা যেদিক থেকে এসেছিলো সেই দিকেই পালিয়ে যেতে থাকে। এভাবেই ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরত্বে ক্রুসেডররা আরেকবার পরাজয় বরন করে। 

সিজার অবরোধ মুক্ত করার পর তিনি আরাকার দিকে যাত্রা শুরু করেন। আরাকা ছিল খ্রীষ্টানদের কেল্লা এর শাসক ছিল কাউন্ট অব ত্রীপলি। ইমাদুদ্দিন জিনকি আরাকাতে আক্রমন করে কাউন্ট অব ত্রীপলিকে পরাজিত করেন। তিনি আরাকা শহরটিকে এমন ভাবে উজাড় ও বিরান করেন যে যাতে ক্রুসেডররা পূর্বের মত এই শহরকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের উপর আক্রমন করতে না পারে। আরাকা জয় করা ইমাদুদ্দিন জিনকি বালবাক্কু শহরের দিকে অগ্রশর হন। বালবাক্কু শহরে ইমাদুদ্দিন জিনকির থেকেও শক্তিশালী বাহিনী বিদ্যমান ছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকি কোন বিশ্রাম না নিয়েই বালবাক্কু শহরে আক্রমন করেন। প্রাচীরের উপর থেকে শত্রুরা মুষলধারে তীর নিক্ষেপ করতে থাকে। ইমাদুদ্দিন জিনকি নতুন কৌশল অভলম্বন করেন তার বাহিনীকে মাথায় ডাল বাধাঁর নির্দেশ দেন। তার বাহিনী মাথায় ডাল বেধেঁ দেয়ালের উপর উঠতে থাকে। দেয়ালে উঠেই মুসলিম বাহিনীর সাথে প্রাচীর রক্ষীদের তীব্র যুদ্ধ হয়। প্রাচীরের রক্ষীদে ঘায়েল করে তারা শহরে ঢুকে পড়ে শহরে ঢুকে বিরত্বের সাথে লড়াই করে তারা শহরের একটি দরজা খুলে দেয়। শহরের দরজা খোলা মাত্রই  ইমাদুদ্দিন জিনকি তার সম্পূর্ন বাহিনী নিয়ে তীব্র বেগে শহরের ভিতরে প্রবেশ করেন এবং বিরত্বের সাথে শত্রুদের শেষ করে বালবাক্কু শহর বিজয় করেন। বালবাক্কু শহর বিজয়ের পর তিনি সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন এবং শহরের উন্নতি সাধন করেন এবং সুলতান সালাহুদ্দিনের আয়ুবীর পিতা নাজিমউদ্দিন আয়ুবীকে সেখানকার শাসক নিযুক্ত করেন।

যৌথ ক্রুসেড বাহিনী পরাজয়ের খবর সারা ইউরোপে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। জার্মানরা এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে এক বিরাট বাহিনী গঠন করে ইস্তানবুলের বাহিনীও তাদের সাথে যোগ দেয়। তারা জেরুজালেমের বাদশাহ ব্যালডনের ও ফ্রান্সের কাছে এই বলে বার্তা পাঠায় তারা যেন তাদের বাহিনী নিয়ে বাহারাইনে চলে আসে তারাও সেইখানেই আসছে উল্লেখ্য যে বাহারাইন তখন খ্রীষ্টানদের দখলে। ইউরোপ ও এশিয়ার খ্রীষ্টানরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে জেরুজালেম, রোমান, জার্মানি, ফরাসী বাহিনী ইউরোপে গিয়ে একত্রিত হবে তারপর তারা সম্মলিত ভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকি কে আক্রমন করবে। জেরুজালেম ও ফরাসী বাহিনী সিদ্ধান্ত মোতাবেক তারা বাহারাইনের দিকে যাত্রা শুরু করে। ইমদুদ্দিন জিনকি তার গোয়েন্দা বিভাগের মাধ্যমে তাদের পরিকল্পনার কথা জেনে যান। তিনি দ্রুত তার বাহিনী নিয়ে বাহারাইনের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। বাহারাইনের উপকন্ঠে ইমাদুদ্দিন জিনকি জেরুজালেম ও ফরাসি বাহিনীর পথ আগলে ধরেন। জেরুজালেম ও ফরাসি বাহিনী ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর ৪ গুন বড় তারপরেও ইমাদুদ্দিন জিনকি লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। বাহারাইনের উপকন্ঠে  ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর সাথে জেরুজালেম ও ফরাসি বাহিনীর সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। উক্ত যুদ্ধেও ইমাদুদ্দিন জিনকী বিরত্বের সাথে উভয় বাহিনীকে পরাজিত করেন। অতঃপর ইমাদুদ্দিন জিনকি  বাহারাইন শহরের দিকে যাত্রা শুরু করেন বাহারাইনের ডাকাতি আর লুটতরাজে তিনি ক্ষুব্দ ছিলেন। বাহারাইনের দূর্গ ছিল অত্যান্ত শক্তিশালী । ইমাদুদ্দিন জিনকি পুরো দূর্গকে ঘেরাও করে ফেলেন কয়েকটি আক্রমনের পরেই তার বাহিনী প্রাচীরের একটি অংশ দখল করে ফেলে অতঃপর তারা প্রাচীর রক্ষীদের পরাজিত করে শহরের দরজা খুলে দেয়। শহরের  দরজা খোলা মাত্রই ইমাদুদ্দিন জিনকি ভিতরে ঢুকে শত্রুদের শেষ করে বাহারাইন তার নিয়ন্ত্রনে নেন।

ঐতিহাসিকগন লেখেন ইমাদুদ্দিন জিনকি বাহারাইন বিজয়ের পর বাহারাইনে আবার আবাদ শুরু হয় এবং লোকালয় আবার মানুষে ভরে উঠে কারন ইমাদুদ্দিন জিনকি নিয়ন্ত্রনে নেওয়ার পর বাহারাইনে হত্যা,ডাকাতি, লুটতরাজ বন্ধ হয়ে যায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ